গ্রামের নাম ছিল শিউলি পাড়া। সন্ধ্যা নামলেই এই গ্রামের রাস্তা ফাঁকা হয়ে যেত। কারণ একটাই—
নীলিমা।
নীলিমা ছিল অদ্ভুত এক মেয়ে। চোখ দুটো অস্বাভাবিক রকমের শান্ত, কিন্তু তাকালেই বুকের ভেতর কেমন জানি ঠান্ডা একটা স্রোত বয়ে যেত। গ্রামে কথা ছিল—নীলিমার জন্মের দিনেই তার মা মারা গিয়েছিল, আর সেই রাতেই গ্রামের তিনটে কুয়োর জল কালো হয়ে গিয়েছিল।
লোকেরা বলত,
“মেয়েটা অভিশপ্ত।”
নীলিমা কারো সঙ্গে মিশত না। দিনের বেলায় সে শিউলি গাছের নিচে বসে থাকত, আর রাতে তার ঘরের জানালা দিয়ে মৃদু আলো বের হত—যদিও ঘরে কোনো বাতি জ্বলত না।
একদিন শহর থেকে আরিফ নামের এক যুবক গ্রামে এলো। সে এসব গল্পে বিশ্বাস করত না। কৌতূহল থেকে এক রাতে নীলিমার বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে ডাকল।
“নীলিমা?”
হঠাৎ জানালাটা খুলে গেল।
নীলিমা ফিসফিস করে বলল,
“চলে যাও… আমাকে দেখলে তোমার জীবন বদলে যাবে।”
আরিফ হাসল।
“আমি ভয় পাই না।”
সেই মুহূর্তে চাঁদের আলোয় নীলিমার মুখ স্পষ্ট হলো। তার ছায়া মাটিতে পড়ল না।
আরিফের গলা শুকিয়ে গেল।
নীলিমা ধীরে বলল,
“আমার ভালোবাসার মানুষদের সবাইকে আমি হারাই। এটা আমার অভিশাপ। যে আমাকে ভালোবাসে… সে বাঁচে না।”
হঠাৎ বাতাস ভারী হয়ে উঠল। চারপাশ থেকে ফিসফিস শব্দ—মৃত মানুষের কান্না।
আরিফ দৌড়ে পালাতে চাইল, কিন্তু পা নড়ল না।
পরদিন সকালে গ্রামের লোকেরা আরিফকে খুঁজে পেল—শিউলি গাছের নিচে, চোখ খোলা, মুখে ভয়ের ছাপ।
আর নীলিমা?
সে আবার জানালার পাশে বসে রইল।
শান্ত চোখে চাঁদের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“আমি চাইনি… তবু অভিশাপ কাউকে ছাড়ে না।”
সেই রাত থেকে শিউলি পাড়ায় আর কেউ রাতের বেলা বের হয় না।
কারণ এখনো মাঝে মাঝে শিউলি ফুলের গন্ধের সঙ্গে শোনা যায় এক মেয়ের কান্না… 🌑

0 মন্তব্যসমূহ
ধন্যবাদ আপনাকে মন্তব্য করার জন্যে 🥰